উদ্বাস্তু-সমস্যা কোনো দুর্ঘটনা নয়

সত্যব্রত, সোহিনী

এন আর সি তৈরি ছিল আসামের বর্তমান বিজেপি সরকারের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান ছাড়াও আরো নানা কারণে আসামে বাইরে থেকে লোক ঢুকেছে। শেষ যে এন আর সি টি তৈরি হয়েছে তাতে নাগরিকত্ব হারানো মানুষের মধ্যে মূলত রয়েছে বাঙালিরা, যদিও নেপালি, বিহারি ইত্যাদি অন্যান্য প্রদেশের লোকজনওভাল পরিমানে রয়েছে। আসামে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের বাঙালিরা ঢুকেছেন। এখন, এই এন আর সি-র আওতাভুক্ত হওয়ার জন্য কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যত লাগছে। যেমন, প্রথম ১৯৫১সালে যে এন আর সি তৈরি হয়েছিল তাতে নাম থাকা অথবা ১৯৭১ সালের ২৪শে মার্চ এর মধ্যরাত অব্দি যে নির্বাচনী রোল তৈরি হয়েছিল তাতে নাম থাকা অথবা উপরোক্ত ব্যক্তিদের উত্তরাধিকারি হওয়া ইত্যাদি। গত অগাস্ট মাসে যে এন আর সি টি তৈরি হয়েছে, দেখা গিয়েছে যে প্রায় চল্লিশ লাখ মানুষের আগের উল্লেখ করা যোগ্যতাগুলির একটিও নেই। হয় তাদের সত্যিই সত্যিই এই সমস্ত দলিলগুলো নেই অথবা তারা হারিয়ে ফেলেছেন। যাই হোক না কেন রাতারাতি নাগরিকত্ব হারিয়ে ফেলা মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় চল্লিশ লাখ। এই চল্লিশ লাখ মানুষকে কি ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হবে নাকি তাদের ‘ঠেলে’ ( push back) নিজেদের জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে নাকি তাদের বিভিন্ন নাগরিক অধিকার যেমন ভোট দেওয়ার অধিকার ইত্যাদি কেড়ে নেওয়া হবে- এন আর সি ঘোষণার পর পরই এইধরনের নানান প্রশ্ন উঠতে থাকে। ভারতজুড়ে এন আর সি-র বিরোধিতা হয়। চাপের মুখে পড়ে আসামের সরকার জানায় যে, এই এন আর সি চূড়ান্ত তালিকা নয়। এটি চূড়ান্ত খসড়া। যারা নাগরিকত্ব হারালেন তারা যদি আবার নিজেদেরকে বৈধ নাগরিক প্রমাণ করতে পারেন তাহলে তারা আবার এন আর সি-র অন্তর্ভুক্ত হবেন। আর যতক্ষণ না চূড়ান্ত তালিকা তৈরি হচ্ছে ততক্ষণ কাউকে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো বা তাদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। যদিও বাতাসে খবর ভাসতে থাকে যে আসামে নাকি ইতিমধ্যেই ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি হয়ে গিয়েছে, কেন্দ্র সরকার থেকে ডিটেনশন ক্যাম্প-এর জন্য অনেক টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে ইত্যাদি। আপাতত এইসব নিয়ে সত্যমিথ্যার বিচার না করে আমরা যদি আসাম থেকে চোখ তুলে নিয়ে সারা পৃথিবীর দিকে তাকাই তাহলে দেখব যে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায় বিভিন্ন দেশে এইভাবে একটা বিরাট অংশের মানুষ উদবাস্তু হয়েছেন। দেশে দেশে তৈরি হওয়া উদবাস্তু-সমস্যা এই মুহূর্তে এই পৃথিবীর অন্যতম দগদগে সমস্যা।

আসামে এন আর সি-র পক্ষে যারা সওয়াল করছেন তাদের অনেকেই বলছেন যে, যারা জাতীয় নাগরিক পঞ্জী-র অন্তর্ভুক্ত হলেন না তারা আসলে ইচ্ছে করে, ভাল কাজের আশায় আসামে এসেছেন। ঠিক এইখানেই উদবাস্তু ছাড়াও আরো একটি ধারণা নিয়ে আলোচনা করা দরকার সেটা হল ‘অভিবসী’। ‘অভিবাসী’ কারা? যারা স্বেচ্ছায় নিজের দেশ ছেড়ে কাজের জন্য অন্য দেশে পাড়ি দেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময় ইউরোপে তৈরি হওয়া উদবাস্তু সমস্যা মোকাবিলা করার জন্যইউনাইটেড নেসান্স হাই কমিশনার ফর রিফিউজি ( UNHCR) তৈরিহয়।মাত্র তিনবছর এই সংস্থাটির কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু ১৯৫১ সালে দেখা গেল উদবাস্তু সমস্যা কেবলমাত্র ইউরোপে আর সীমাবদ্ধ নেই। সারা পৃথিবীজুড়ে বিশেষ করে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ ইত্যাদি জায়গায় এই সমস্যা এক ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সব জায়গাতেই উদবাস্তুদের জন্য একধরনের মানবিক সহায়তার দরকার পড়ছে। ফলে UNHCR একটি স্থায়ী সংস্থায় পরিণত হল। UNHCR ১৯৫১ সালে উদবাস্তুর যে সংজ্ঞা তৈরি করে তা সহজ ভাষায় বললে যেটা দাঁড়ায় সেটা হলঃ কোনো ব্যক্তি যদি তার জাত, বর্ণ, ধর্ম, জাতীয়তা, রাজনৈতিক মতামত, নির্দিষ্ট সামাজিক দলের মধ্যে থাকা ইত্যাদির কারণে নিপীড়ণের ভয় যে দেশে সে বসবাস করত সেখান থেকে উৎখাত হতে বাধ্য হয় এবং আবার তার পুরোনো দেশে ফিরে যেতে না পারে বা না চায় তাহলেই তাকে উদবাস্তু বলা হবে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয়জনিত কারণে যারা উদবাস্তু হচ্ছেন তাদের সহায়তার জন্য আলাদা একটি কোটা তৈরি হয়েছে ইদানীংকালে। পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন দেশ এই উদবাস্তুদের গ্রহণ করে। যে দেশে তারা থাকতে শুরু করে সেই দেশ তাদের ‘উদবাস্তু’ স্ট্যাটাসে রেখে দেয়। ফলে তারা কিছু নির্দিষ্ট নাগঅরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। আর যদি কোনো দেশ তাদের গ্রহণ না করে তাহলে তারা রাষ্ট্রহীন নাগরিকে পরিণত হন। রাষ্ট্রহীন নাগরিক মানে থাকার জায়গা, জীবীকা, চিকিৎসা, শিক্ষা ইত্যাদি নানাধরনের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত কিছু মানুষ। UNHCR-এর তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে, বিবাদ ও নিপীড়ণের ভয় প্রতি দু সেকেণ্ডে একজন মানুষ তার নিজের জায়গা থেকে উৎখাত হচ্ছেন। UNHCR-এর ২০১৮ সালের জুন মাসের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী সারা পৃথিবী জুড়ে উদবাস্তু হওয়া মানুষের সংখ্যা ৬.৮৫কোটি।এর মধ্যে ২.৫৪কোটি উদবাস্তু স্ট্যাটাস পেয়েছে। এই ২.৫৪কোটির মধ্যে অর্ধেকের বয়স ১৮-র নিচে। ১কোটি মানুষ রাষ্ট্রহীন।বার্মার রাখাইন প্রদেশ থেকে উৎখাত হওয়া রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গার সংখ্যাই প্রায়ছ’ লাখ। এই মুহূর্তে পৃথিবীতে সব চাইতে বেশি উদবাস্তু তৈরি করছে সিরিয়া। সিরিয়া ২০১০ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত ১.৩৫ কোটিরও বেশি উদবাস্তু তৈরি করেছে। সিরিয়া ছাড়াও পৃথিবীর মোট উদবাস্তুর একটা বড় অংশ আসে দক্ষিন-সুদান ও আফগানিস্তান থেকে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে দুটো। প্রথমত, দেশ এবং তার সীমানা কী সত্যিই এতটা পবিত্র ও শাশ্বত কোনো কিছু যা একেবারে অপরিবর্তনীয়। এর উত্তর দুরকম ।

 আসামে এন আর সি-র পক্ষে যারা সওয়াল করছেন তাদের অনেকেই বলছেন যে, যারা জাতীয় নাগরিক পঞ্জী-র অন্তর্ভুক্ত হলেন না তারা আসলে ইচ্ছে করে, ভাল কাজের আশায় আসামে এসেছেন। ঠিক এইখানেই উদবাস্তু ছাড়াও আরো একটি ধারণা নিয়ে আলোচনা করা দরকার সেটা হল ‘অভিবসী’। ‘অভিবাসী’ কারা? যারা স্বেচ্ছায় নিজের দেশ ছেড়ে কাজের জন্য অন্য দেশে পাড়ি দেয়। উদবাস্তু আর অভিবাসী-র মধ্যে পার্থক্য হল যে, উদবাস্তুরা নিজের দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় আর অভিবাসীরা স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়ে। অভিবাসীরা আবার চাইলে নিজের দেশে ফিরে যেতে পারে।কিন্তু খুব ভালভাবে অনুধাবন করলে দেখা যাবে যে, প্রথমত আসলে সবাই বাধ্যতামূলকভাবেই দেশ ছাড়ে । দাঙ্গা, যুদ্ধ-বিগ্রহ ছাড়াও উপযুক্ত কাজ না পেয়ে দেশ ছাড়াও আসলে বাধ্যতামূলকভাবে দেশ ছাড়াই। আরপ্রকৃতপক্ষে কেউই আর নিজের দেশে ফিরতে পারে না। যে দেশে সে বসবাস করতে শুরু করে সেটাই তার দেশ হয়ে যায়। শুধু তাই নয় যে সময়টায় সে এই দেশে থাকে সেই গোটা সময়টাজুড়ে সে এই দেশে শ্রম দেয়। এক্ষেত্রে আমরা উদাহরণ হিসেবে রোহিঙ্গাদের দিকে তাকাতে পারি। রোহিঙ্গারা কয়েক শতক ধরে বার্মার রাখাইন প্রদেশে রয়েছে। তাদের উদ্ভবের ইতিহাস নিয়ে অনেকরকম বক্তব্য থাকলেও এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে তারা রাখাইনে থেকেছে দীর্ঘ সময় এবং সেই জায়গাকে সুজলা-সুফলা করে তুলেছে। বিশ শতকের শেষদিক থেকে তাদের ওপর অত্যাচার শুরু হয়েছে। তাদেরকে বেআইনী ঘোষণা করা হয়েছে। সাম্প্রতিককালে তাদের দেশ ছাড়া করা হয়েছে। কিন্তু তাদের শ্রমটা এই গোটা সময়টায়  ভালভাবেই আত্মসাৎ করা হয়েছে। অথবা যদি আমরা তাকাই আমেরিকা-মেক্সিকো বর্ডারের দিকে, আমরা দেখব আমেরিকা জুড়ে মেক্সিকানরা কেউ রেস্টুরেন্টে কাজ করছেন, কেউ সেলুনে তো কেউ বারে, কেউ ক্ষেতে-ক্ষামারে। কিন্তু তারপরেও কিছুদিন অন্তর অন্তর তাদেরকে নানা নিয়ম জারি করে দেশে পাঠানোর হুমকি দেওয়া হয়। ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারে বলেন যে তিনি মেক্সিকো বর্ডারে একটি বড় পাঁচিল তুলে দেবেন। এইসব প্রচার আসলে মেক্সিকো থেকে আসা অভিবাসী শ্রমিকদেরকে হুমকি! আসামের দিকে তাকালেও দেখতে পাব যে বাংলাদেশ থেকে একসময় আসামে চাষের কাজ করার জন্য চাষের কাজ জানা প্রচুর বাঙালী চাষী এসেছিলেন। তারা আসামে চাষ করেছেন। আসামকে সুজলা-সুফলা করে তুলেছেন। চা-চাষের জন্য বৃটিশরা সারা ভারত থেকে লোক নিয়ে গিয়েছে আসামে। তারা আসামে চা-চাষের কাজ করেছে। এরফলে একইসাথে তাদের জীবীকার্জন হয়ছে অন্যদিকে আসাম পেয়েছে আন্তর্জাতিকমানের রপ্তানিযোগ্য একটি দ্রব্য। এখন এন আর সি তৈরির ফলে এদের মধ্যেই কেউ কেউ নাগরিকত্ব হারাচ্ছেন। ফলে যারা স্বেচ্ছায় শ্রম দিতে এসেছিলেন তারা উদবাস্তুতে পরিণত হতে চলেছেন। অভিবাসীরা উদবাস্তুতে পরিণত হতে চলেছেন। এখানে প্রসঙ্গত বলে রাখা দরকার অভিবাসী আর ‘উদবাস্তু’ এই দুটি স্ট্যাটাসের কিন্তু সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার দিক থেকে অনেক পার্থক্য আছে। কেউ যদি কোনো দেশের উদবাস্তু হন তাহলে সেই দেশ তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য রেখে দিতে বাধ্য। কিন্তু অভিবাসীকে সে রাখতে বাধ্য নয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে দুটো। প্রথমত, দেশ এবং তার সীমানা কী সত্যিই এতটা পবিত্র ও শাশ্বত কোনো কিছু যা একেবারে অপরিবর্তনীয়। এর উত্তর দুরকম । প্রথমত পাসপোর্ট, ভিসা-র ধারণা খুব পুরোনো কিছু নয় । দ্বিতীয়ত, যে সীমান্ত রক্ষার জন্য এত আয়োজন, এত অস্ত্র কেনাকাটা, সেইসব অস্ত্রগুলোই দেখা যাচ্ছে যে বিদেশ থেকে আমদানী করা হচ্ছে! যে আমেরিকা ও মেক্সিকোর মধ্যে এত সমস্যা সেই আমেরিকা ও মেক্সিকোর মধ্যে যাতে জিনিষপত্র ও পরিষেবা সুষ্ঠুভাবে আদান-প্রদান করা যেতে পারে তার জন্য ভাল ভাল রাস্তা তৈরি হচ্ছে। শোনা যাচ্ছে যে, ভারত থেকে চীনে নাকি ট্রেন লাইন পাতা হবে ! ট্রেনে করে পর্যটক যাবে-আসবে, জিনিষ-পত্র আসবে-যাবে! তাহলে কেন মানুষ যাতায়াতে এত সমস্যা! যদি জিনিষপত্র এ দেশ থেকে ওদেশে যেতে পারে তাহলে মানুষও যেতে পারবে না কেন?! আরও খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে, এই ট্রেন লাইন পাতা, রাস্তা তৈরি করার জন্য কিছু মানুষ নিশ্চয় এদিক থেকে ওদিকে যাবেন ! তারপর তারা দীর্ঘদিন সেখানে এই কাজ করবেন। তারপর তারা সেখানে শেকড় বিস্তৃত করবেন-মানে সেখানে তাদের সন্তানসন্ততি হবে। তারা সেখানকার স্কুল কলেজে পড়বে। এবং একসময় তারা সেখানে থেকেও কোনো না কোনো নিয়মের মধ্যে দিয়ে গিয়ে হয় উদবাস্তু অথবা অভিবাসী শ্রমিকের স্ট্যাটাস পাবেন! ঠিক এখান থেকেই দ্বিতীয় প্রশ্নটা আসে। তাহলে এই অভিবাসী বা উদবাস্তু তৈরি হওয়া কী নিছকই কোনো দুর্ঘটনা নাকী অন্যকিছু? ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে যে, পাশাপাশি দুটো রাষ্ট্রের মধ্যে, মাঝখানে সীমান্তকে রেখে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব-মধুর সম্পর্ক। মেক্সিকো-আমেরিকা, ভারত-বাংলাদেশ, বার্মা-বাংলাদেশ ইত্যাদি এইধরনের সম্পর্কগুলো নানাধরনের দ্বিপাক্ষিক, কখনো ত্রিপাক্ষিক চুক্তিতে চুক্তিতে ক্ষত-বিক্ষত। কখনো সীমান্ত আলগা করা হচ্ছে, কখনো সীমান্ত এঁটে দেওয়া হচ্ছে। কারণটা ঠিক কী? উত্তরটা খুবই সহজ। সস্তার শ্রম। যখন দেশে শ্রম-শক্তি কম পড়ছে তখন তা যোগানোর জন্য অন্য দেশ থেকে লোক আনা হচ্ছে। তারপর আবার যখন তাদের আর দরকার পড়ে না তখনই তাদের দেশে ফেরানোর চেষ্টা চালানো হয়। তাদের বেআইনী  ঘোষণা করা হয়। ফলে তারা আরো সস্তার শ্রমে পরিণত হয়। তাদের মাথার ওপর ঝুলতে থাকে ‘উদবাস্তু’ হয়ে যাওয়ার, বা ‘বেআইনী’ ঘোষিত হওয়ার খাঁড়া। খাঁড়া সততই ভয়ের বস্তু। ফলে তারা ভয় ভয় থাকে। তারা মজুরি বাড়ানোর দাবী তুলতে পারে না, কাজের ঘন্টা কমানোর দাবী তুলতে পারে না, সংগঠিত হতে পারে না, ইউনিয়ান তৈরি করতে পারে না। তারা কোনো ধরনের বিদ্রোহ সহজে করতে পারে না। পুঁজিবাদ একটি বিশ্বব্যবস্থা। তার তাই সারা বিশ্বজুড়ে শ্রমশক্তির দরকার যা চলমান, ‘মোবাইল’। কিন্তু শ্রমশক্তির এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যাতায়াত নিয়ন্ত্রণের অন্যতম বন্দোবস্ত হল সীমান্ত, কাঁটাতার। মানে যাতায়াতটা যাতে পুঁজির নিয়মে এবং কেবলমাত্র পুঁজির নিয়মেই হয় তার জন্য তার দেশ ও দেশের কাঁটাতার দরকার। দেশের সীমান্ত কেমিস্ট্রির ল্যাবের ক্ল্যাম্পের মতো। ইচ্ছেমতো আলগা করা যায়, ইচ্ছে মতো এঁটে দেওয়া যায়। ফলে না তার কোনো পবিত্রতা আছে, না তা অপরিবর্তনশীল আর  না কাঁটাতার পেরিয়ে মানুষের এদিক-ওদিক যাতায়াত কোনো দুর্ঘটনা, ‘এক্সিডেন্ট’। লেখাটা শেষ করা যাক বিখ্যাত মার্কিন গায়ক-গীতীকার উডি গাথরির একটি গান দিয়ে, গানটির নাম ‘ডিপোর্টি’ । মেক্সিকোর ‘ডিপোর্টি’দের নিয়ে, যাদের কোনো নাম থাকে না, যাদের শুধু ‘ডিপোর্টি’ বলেই ডাকা হয়, সেই তাদের নিয়ে লেখা গান, ১৯৪৮ সালে-

‘The crops are all in
The peaches are rotting
The oranges are all piled in their creosote dumps
They’re flying them back to the Mexico Border
To take all their money to wade back again…

You won’t have a name when you ride the big airplane
All they will call you will be Deportees’

যার খুব বোধগম্য অ-কাব্যিক বাংলা করলে দাঁড়ায়-

‘ফসল তোলা হয়ে গেছে,

কমলালেবু জড়ো করা হয়েছে গিয়েছে…

এখন তোমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে,

…এখন তোমাদের কোনো নাম নেই

…শুধুই ডিপোর্টি’

ছবি: দ্য রিপাবলিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *