আসামের জাতি বিদ্বেষ ও দাঙ্গার পটভূমি

মীরা রায়

ব্রিটিশ শাসন 

১৮২৬ সালে ব্রিটিশ শাসকরা অহম ও আরাকান রাজাদের পরাজিত করে অসমকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির সাথে যুক্ত করে।সেই সময়ে অসমের আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা খুব কম ছিল। ব্রিটিশ শাসকরা পর্যাপ্ত রাজস্ব আদায়ের জন্য অসমে শিল্প ও কৃষি উৎপাদন দ্রুত বাড়াতে চাইছিল। এই উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে সস্তায় মজুর নিয়ে আসা শুরু হয় এবং এর সাথে সাথে কাজ ও ব্যাবসার জন্যও বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ   অসমে আসতে শুরু করে। এই অভিবাসীদের পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায় — 

১) যে মজুরদের  বিহার, উড়িষ্যা, ছোটনাগপুর, মাদ্রাজ, পশ্চিম ও মধ্য ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চা বাগানে কাজ করার জন্য আনা হয়েছিল; ২) কৃষিমজুর, যাদের মূলতঃ আনা হয়েছিলো পূর্ববাংলার বিভিন্ন জেলা থেকে; ৩) পশুপালনের কাজ করত নেপাল থেকে আসা অভিবাসীরা; ৪) ব্যাবসায়ী ও দক্ষ কারিগর ও মিস্ত্রীরা; ৫) তেল ও কয়লাখনির শ্রমিক, বেতনভোগী কর্মচারি, প্রশাসনিক কর্তা ও বাগান মালিকরা; যারা এসেছিলো দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে।  

চা আবিস্কার 

১৮৩০ সাল নাগাদ আসাম চা  আবিস্কার হয়েছে এবং ১৮৩১ সালের মধ্যে লন্ডনে সেই চায়ের বাজার যাচাই হয়ে গেছে। তাই চা শিল্পের কারখানা অবিলম্বে শুরু করতে হবে।সেই সময়ে অসমে চা বাগানে কাজ করার মতো কঠোর পরিশ্রমী তরুণ/তরুণী মজুরের  খুব অভাব ছিল। প্রথমদিকে চীন শ্রমিকদের আনা হোত কারণ চীনা শ্রমিকরা চা চাষ এবং প্রক্রিয়াকরণে বিশেষ পারদর্শী ছিল। উৎপাদন বাড়ার সাথে সাথে স্থানীয় জনজাতিদের কাজে নিযুক্ত করা হয় কিন্তু তারাও সংখ্যায় যথেষ্ট ছিল না। ফলে শুরু হোল অন্য রাজ্য থেকে মজুর নিয়ে আসার প্রক্রিয়া । ১৮৫০ এর দশক থেকে অসমে দেশের সবচেয়ে গরিব অঞ্চলগুলি থেকে মজুর আমদানি শুরু হোল। আড়কাঠি লাগিয়ে, লোভ দেখিয়ে, আগাম ধার দিয়ে এই চা শ্রমিকদের আনা হোত। মজুর আমদানি প্রক্রিয়ায় অসমে আসার পথেই ১০% লোক মারা যেত। তারপর নামমাত্র মজুরির বিনিময়ে অজানা দেশে চাবুক খেয়ে জঙ্গল কেটে বাগান গড়ে তোলা, ম্যালেরিয়া কালাজ্বরের প্রকোপ সহ্য করে টিকে থাকা  খুব সহজ নয়। এই হাড়ভাঙা খাটুনি সহ্য করতে না পেরে চীনা শ্রমিকরা অনেক আগেই অসম ছেড়ে চলে যায়। পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ধরা পড়লে শ্রমিকদের কপালে জুটত কড়া শাস্তি। 

কয়লা ও তেল আবিস্কার

১৮৬৭ সালে অসমের ডিগবয় অঞ্চলে প্রথম তেল আবিস্কার হয়। ১৯০১ সালে ডিগবয় এ এশিয়ার প্রথম তেল শোধনাগার চালু হয়।

১৮২৫ সালে অসমের মাকুম অঞ্চলে কয়লা খনি আবিস্কার  হয় ও ১৮২৮ সালে প্রথম কয়লা উত্তোলন করা হয়। ১৮৮১ সাল থেকে পুরোদমে কয়লা তোলা শুরু হয়। 

ইতিমধ্যে স্টিমার পরিষেবা (১৮৪৭) ও ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। অসম ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে।

আর এই মহাকর্মযজ্ঞ সম্পন্ন হয়েছে বিহার,ছোটনাগপুর এবং মধ্য ও পশ্চিমভারতের মত রাজ্য থেকে আমদানি করা গরীব আদিবাসীদের কঠোর শ্রম। 

কৃষিতে পরিযাণ  

ব্রিটিশরা যখন অসমকে ভারতের সাথে সংযুক্ত করে তখন প্রচুর পরিমানে জমি পতিত অবস্থায় পড়ে ছিল। ব্রক্ষ্মপুত্রের বানভাসি চরে ধান ফলানোর দক্ষতা তখনকার অসমের চাষিদের ছিল না। জমিতে উৎপাদন না বাড়ালে, পণ্য তৈরি না হলে সরকার কর আদায় করবে কিভাবে, তাই ব্রিটিশদের উৎসাহে ১৮৮৫ সালের পর থেকেই  পূর্ববাংলার চাষিদের রায়ত হিসাবে ব্রক্ষ্মপুত্রের চর এলাকায় বসানো শুরু হোল।

আগেই আলোচনা করা হয়েছে যে চা-বাগান পত্তন, তেল,কয়লা উত্তোলন, রেললাইন স্থাপন, সরকারি অফিস কাছারির পত্তন এইসব নানা কর্মকান্ডের জন্য অসমে প্রচুর জনসমাগম হয়েছে ফলে খাদ্যের চাহিদাও বেড়েছে। তাই শুধু ইংরেজ নয় প্রথম দিকে অসমিয়া জমিদার শ্রেণিও পূর্ববঙ্গের চাষিদের রায়ত হিসাবে নিজেদের জমিদারিতে বসাতে চেয়েছিলো। ১৮৯৭ সালের মার্চ মাসে অসম এসোসিসনের বাবু গুঞ্জানন বরুয়া ব্রিটিশ সরকারকে জানাচ্ছেন—  অসমে ৭০.১৫ জমি পতিত পড়ে আছে। পূর্ববঙ্গের চাষিদের যেন বিশেষ সুবিধায় জমি দেওয়া হয়, যাতে এই পতিত জমিতে সব রকমের অর্থকরী  শস্য উৎপাদন করা যায়। 

 যে বীজ জলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে ওঠে, সেই বীজ পুর্ববঙ্গের চাষিরা সঙ্গে করে এনেছিলেন, যার খোঁজ অসমের আদিবাসী বা অসমিয়া হিন্দু চাষিরা জানতেন না ।

শুধু ধান নয় অর্থকরী ফসল হিসাবে পাটচাষ ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ।আর এই পাটচাষের জন্য জমির চাহিদা বাড়ছিলো। উনিশ শতকের শেষদিকে হুগলী নদীর দুপারে চটকল গজিয়ে উঠতে থাকে। কাঁচামালের চাহিদা বাড়তে থাকে। আগে পূর্ববাংলা থেকে কাঁচামালের যোগান আসত। বিশ শতকের শুরুতে পূর্ববাংলায় পাট উৎপাদনের জমি শেষ হয়ে আসে ফলে উপনিবেশীয় শাসকরা নতুন জমির খোঁজ করতে সচেষ্ট হল। 

অসমে ধান এবং পাট চাষের জন্য প্রচুর অনাবাদি জমি ছিল কিন্তু চাষ করার মানুষ ছিল না। এই ঘাটতি পূরণের জন্য পুর্ববঙ্গের গরিব মুসলমান চাষিদের পত্তন শুরু হয়। 

প্রশাসনিক কাজ ও ব্যবসা-বানিজ্যের জন্য পরিযাণ 

সরকার চালাবার জন্য সরকারি চাকুরেদের আনা হয়, আসে নানা পেশায় যুক্ত বিভিন্ন ভাষাভাষির মানুষ ও বাবসায়ীরা। ইংরেজদের চালু করা শিক্ষায় অন্যান্যদের তুলনায় হিন্দু বাঙ্গালিরা বেশি শিক্ষিত হয়েছিল ফলে সরকারি চাকরিতে তারাই বেশি সুযোগ সুবিধা পেয়েছিল।১৮৩৮ সালে ইংরেজির সাথে বাংলাকে অফিসিয়াল ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।  

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে পরিযাণ 

১৮৭৩ সালে অসমকে আলাদা প্রদেশ করা হয় একই সঙ্গে    সিলেট জেলাকে পূর্ববঙ্গ থেকে কেটে অসমের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষিত বাঙ্গালিদের সংখ্যা ও প্রতিপত্তি দুই  বাড়ে।            

১৯০৫ সালে প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ব্রিটিশ শাসকরা বাংলা ভাগ করে। পূর্ববঙ্গকে অসমের সাথে জুড়ে দিয়ে ঢাকা শহরকে রাজধানী করা হয়। ফলে পূর্ববাংলা থেকে পরিযানের  থেকে স্রোত বেড়ে যায়। প্রবল বিক্ষোভের ফলে ১৯১১ এই বঙ্গভঙ্গ বাতিল করা হয়। 

সুতরাং দেখ যাচ্ছে ব্রিটিশরা অসম দখলের সাথে সাথে অসমের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতি  আমূল পাল্টে যায়। উপনিবেশ শাসনের হাত ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অসমে এক বিরাট সংখ্যক মানুষ বসতি স্থাপন করে।ফলে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে প্রবল অস্থিরতা দেখা দেয় ।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরে হিন্দু উদ্বাস্তুদের স্রোত অসমে এসেছে। ১৯৭১ বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় এক কোটি উদ্বাস্তু ভারতে আশ্রয় নেয়।

পরিযাণ ও জাতিবিদ্বেষ 

মানব সভ্যতার বিকাশের  ক্ষেত্রে পরিযাণ কোন নতুন ব্যাপার নয়। আজকের আমেরিকা ইউরোপীয় দখলদারদের সৃষ্টি, আফ্রিকাতেও ইউরোপীয়রা  উপনিবেশ স্থাপন করেছে, শ্রীলঙ্কা এবং মালেশিয়ায় ভারতীয়রা বসতি স্থাপন করেছে জীবন জীবিকার স্বার্থে। আর গত দুতিন বছর ধরে পশ্চিম এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকা থেকে ইউরোপে উদ্বাস্তুদের স্রোত তো ইউরোপের  রাজনীতি এবং অর্থনীতিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করছে। এতদসত্ত্বেও এটা মাথায় রাখতে হবে উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীর সাথে যে দেশে বা এলাকায় তারা বসতি স্থাপন করছে সেখানকার মানুষদের সম্পর্ক খুব সহজ হয় না। অঞ্চলের আদি বাসিন্দারা নিজেদের সংস্কৃতি, ভাষা হারানোর ভয় পান। জমি বা ব্যবসায় ভাগ বসানো, চাকরির প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়ার উৎকন্ঠা তাদের তাড়া করে বেড়ায়।

অসমের ক্ষেত্রেও এই ভয় কাজ করেছে। 

খিলঞ্জীয়া অসমীয়াদের উদ্বেগ পুরোটা অমূলক ছিল না। ত্রিপুরার জনজাতিদের নিজভূমে সংখ্যালঘু হওয়ার উদাহরণ আছে। ইংরেজ দেশ ছাড়ার আগে থেকেই অসমিয়া জাতি বিপন্ন হয়ে পড়ছে বলে অসমিয়া বুদ্ধিজীবীদের একাংশ দাবি করছিল। 

দেশ যখন স্বাধীন হয়  কংগ্রেস ছিল প্রধান রাজনৈতিক দল।কিন্তু কংগ্রেসের ভিতরে এবং বাইরে গড়ে উঠেছিলো তীব্র অসমিয়া জাত্যাভিমানি শক্তি, যারা মনে করতো বাংলা ভাষা অসমিয়া ভাষা ও সংস্কৃতিকে গ্রাস করে নেবে। 

৭মে, ১৯৪৯ তারিখে অসমের মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলুই প্রধানমন্ত্রী নেহরুকে বলেন ‘পূর্ব পাকিস্থান থেকে আগত বাঙালি উদ্বাস্তুদের অসমে পুনর্বাসন দিলে রাজ্যে জমির উপর চাপ বাড়বে।’ এর উত্তরে প্রধানমন্ত্রী নেহরু জানান অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় অসমের জমি অনুযায়ী জনসংখ্যার ঘনত্ব কম। তাই অসমের সীমান্তবর্তী পূর্ববঙ্গের মানুষ অসমে আসতে চাইলে সেখানেই তাদের পুনর্বাসন দিতে হবে। জমি বন্টনের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়ে দেয় উদ্বৃত্ত খাস জমি স্থানীয় ও উদ্বাস্তুদের মধ্যে ৫০ঃ৫০ হারে বিলি করতে হবে।

 উদ্বাস্তু সরকারি কর্মচারিদের অসম সরকারে চাকরি দিলে স্থানীয়রা চাকরি পাবে না– শ্রী বরদলুই -এর এই বক্তব্যও নেহরু গ্রহণ করেন নি। তাঁর যুক্তি ছিল এই কর্মচারিরা দেশভাগের জন্য যেখানে যাবেন সেই রাজ্যেই চাকরি পাবেন — এটাই প্রতিশ্রুতি, আর তাদের সংখ্যাও বেশি নয়। স্বাধীনতার পরের তিরিশ বছর অসমে কংগ্রেসের একচ্ছত্র ক্ষমতা ছিল। বহিরাগত-বিরোধী রাজনীতি তেমন জমি পায় নি। বহিরাগত নিয়ে আন্দোলন, বিক্ষোভ হয়েছে কিন্তু নিয়ন্ত্রের বাইরে যায় নি। 

হতাশ অসমিয়া জাত্যাভিমানিরা প্রথম ১৯৫০ সালে বাঙালিদের ওপর প্রবল আক্রমণ চালায়। কয়েক হাজার বাঙালি ব্রক্ষ্মপুত্র উপত্যকা ছেড়ে পশ্চিমবাংলা ও বরাক উপত্যকায় আশ্রয় গ্রহণ করে। আবারও ১৯৬০ সালে অ-অসমিয়া(মূলত বাঙালি) ও অসমিয়াদের মধ্যে ব্রক্ষ্মপুত্র উপত্যকা জুড়ে দাঙ্গা ছড়ায়।

অসমিয়া জাত্যাভিমানিদের চাপে অসম সরকার ১৯৬১ সালে বিধানসভায় রাজ্যভাষা বিল পাস করে যাতে অসমিয়াকে রাজ্যের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। 

এর বিরুদ্ধে বাংলাভাষীরা তীব্র বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ১৯৬১সালের ১৯ মে বিক্ষোভকারীদের উপর শিলচর স্টেশনে অসম রাইফেলস গুলি চালায় যার ফলে ১১জন শহীদ হন। এর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রতিবাদ হয়। ওই সময়ে দুর্গাপুরে সর্ব ভারতীয় কংগ্রেস অধিবেশনে পন্ডিত নেহরুসহ কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ কাছাড়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নীরবতা পালন করেন। কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী অসমে যান। বরাক উপত্যকার তিন জেলার জন্য বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসাবে মেনে নেওয়ার জন্য তিনি অসম সরকারকে নির্দেশ দেন। ফলে নতুন অধ্যাদেশ জারি করে বাংলা ভাষাকে বরাক উপত্যকার তিন জেলার প্রধান সরকারি ভাষা করা হয় যা এখনও জারি আছে। 

ষাটের দশক পর্যন্ত কংগ্রেস বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে বেঁধে রেখে একটা মঞ্চ হিসাবে কাজ করছিল। কিন্তু পাহাড়ি  জনজাতিরা আর অসমের সাথে থাকতে চাইছিল না।জন্ম হয় নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, মেঘালয়- র মতো নতুন রাজ্যগুলির। সত্তর দশকের শেষদিকে কংগ্রেসের বাইরে দাঁড়িয়ে অসম জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলি জনসমর্থন পেতে শুরু করে। এর পিছনে বাস্তব কিছু কারণ অবশ্যই ছিল। 

অসম ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ার পর থেকে এই রাজ্যের প্রাকৃতিক সম্পদ রাষ্ট্রের হাতে এসেছে কিন্তু সেই অনুপাতে রাজ্যের আদি জনজাতিদের উন্নয়ন ঘটে নি। এর সাথে অসমে ভারতের সামরিক, আধা-সামরিক বাহিনীর লাগাতার অবস্থান মানুষের ক্ষোভকে বাড়িয়ে তুলেছে। আর্মড ফোর্সেস স্পেসাল পাওয়ার আইন অসমে ও মনিপুরে ১৯৫৮সাল থেকে লাগু আছে, এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে গত ২৮ অগাস্ট ২০১৮ অসমের রাজ্যপাল পুরো অসমে আগামী ছমাসের জন্য আফস্পা-র মেয়াদ বাড়িয়েছেন। এই আইনের জোরে সামরিক বাহিনী সাধারণ নাগরিকদের উপর উপর নির্মম অত্যাচার চালিয়ে আসছে। এই কারণগুলির জন্য অসমের আদি জনজাতিদের কাছে –অসম ভারতের উপনিবেশ, এই উপলব্ধি মান্যতা পায়। ভারত রাষ্ট্র থেকে অসমকে স্বাধীন করার জন্য ১৯৭০ সালের শুরুতে ‘ইউনাইটেড ফ্রন্ট অফ আসাম’ বা ‘আলফা’ গড়ে ওঠে। ভারত রাষ্ট্র নির্মমভাবে ‘আলফা’- র এই চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করে। 

বিদেশি তাড়ানোর আন্দোলন

১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের সময় হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত পার হয়ে ভারতে চলে আসেন।

১৯৭৮ সালে তৎকালীন চিফ ইলেকশন কমিশনার শ্যামলাল শাকধের মন্তব্য করেন যে শুধুমাত্র অসমে  ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৭১ সালে  ৩৪.৯৮  শতাংশ জনসখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে ফলে ভোটার লিস্টে ভোটারের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এই জনসংখ্যা বৃদ্ধি বিদেশী তাড়ানোর দাবিকে ইন্ধন জোগায়। 

অসমিয়াদের থেকে বাংলাভাষী মানুষ সংখ্যায় বেশি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বিদেশি তাড়াও আন্দোলনকে জোরদার করে। এই চাপের মুখে ব্রক্ষ্মপুত্রের চর-চাপারির সাবেক পূর্ববঙ্গ থেকে আসা বাঙালি মুসলমানরা বাধ্য হয়েছিলেন ১৯৫১ সালের জনগণনায় নিজেদের অসমিয়াভাষী হিসাবে পরিচয় দিতে, বাধ্য হয়েছিলেন জীবন বাঁচাবার ভয়ে, জমি জীবিকা হারানোর ভয়ে। নিজেদের হাতে গড়া বহু বাংলা মাধ্যম স্কুল  হয় পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বা অসমিয়া মাধ্যম স্কুলে বদলে দেওয়া হয়েছিল। 

এতদসত্ত্বেও শেষরক্ষা হয় নি।

১৯৭৫ সালের পর কংগ্রেসের জনসমর্থন কমে যায়।  জনজাতিসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর মঞ্চ হিসাবে যে মান্যতা কংগ্রস পেত তাতে ভাঙন ধরে।১৯৭৫ সালে অভ্যন্তরীণ  জরুরী অবস্থা জারীর ফলে কংগ্রেস সুনাম হারায়। ইন্দিরা গান্ধীর সমর্থক ও বিরোধী —  পার্টি এই দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। ১৯৭৮ সালে অসম বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস হেরে যায় , ক্ষমতায় আসে জনতা পার্টি সরকার। নতুন  সরকার বিদেশিদের বেছে বেছে বহিস্কার করার পদক্ষেপ নেয়। এই কাজে অসমিয়া জাতিয়তাবাদী সংঠনগুলি যেমন ‘আসু’, ‘অসম সাহিত্য সভা’, ‘পূর্বাঞ্চলীয় লোক পরিষদ’, অসম জাতীয় দল সামিল হয়। এদের নেতৃত্বে শুরু হল ‘বঙ্গাল খ্যাদা’। ইন্ডিয়ান অয়েল- এর ইঞ্জিনিয়ার রবি মিত্রকে হত্যা করা হয়।

বামপন্থী দলগুলি, কংগ্রেসের বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী, কংগ্রেস(ই) – এই দলগুলি বলছিল যাদের বিদেশি বলে দাগিয়ে দেয়া হচ্ছে তারা অনেকেই দেশভাগের পরে আসা উদ্বাস্তু। 

আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল ৪০ লক্ষ বিদেশির নাম ভোটার তালিকায় রেখে ভোট করানোর কোন মানে হয় না । ভোট বয়কটের আন্দোলন চলতে থাকে। হিংস্রতা, অগ্নিসংযোগের ঘটনা বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি চরমে ওঠে ১৯৮৩ সালে। 

১৯৮৩ জানুয়ারিতে ইন্দিরা গান্ধী বিদেশিদের নাম বাতিল করার দাবি খারিজ করে ফেব্রুয়ারিতে একসাথে বিধানসভা ও লোকসভার নির্বাচনের দিন ঘোষণা করেন। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে হিংস্রতার তীব্রতা বাড়তে বাড়তে ১৮ তারিখ মহাপ্রলয়ে পরিণত হয়ে নেলীর ওপড়ে আছড়ে পড়ে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী পরিকল্পিতভাবে ২২০০ মানুষকে হত্যা করা হয়।সবাই বাঙ্গালি মুসলমান।  বেশিরভাগ নারী,কিশোরী, শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, যাঁরা দৌড়ে নিরাপদ জায়গায় পালাতে পারেন নি। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় ঘরবাড়ি, ফসল, আহত অসংখ্য। গণহত্যা ঘটার অনেক পরে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী আসে। অভিযোগ, হত্যাকারীরা  মূলতঃ তিওয়া জনজাতির মানুষ, ‘আসু’ সমর্থক অসমিয়ারাও এদের সাথে যোগ দিয়েছিল। ঘটনার কারণ হিসাবে বলা হয় যে মুসলমান বাঙ্গালিরা তিওয়াদের জমি গ্রাস করে বসতি স্থাপন করছিল। সেই রাগ- ক্ষোভই ১৮ ফেব্রুয়ারি ফেটে পড়ে। উল্লেখ করা দরকার নেলীর বাঙ্গালী মুসলমানরা ১৯৩০ সাল থেকে ওখানে চাষাবাদ করছে। সরকারি তথ্য, জমির রেকর্ড সেই সাক্ষ্য দেয়। নেলীতে তিওয়াদের জমি যেমন ছিল, সরকারি খাস জমিও ছিল। জমি নিয়ে অভিবাসী-আদিবাসী বিবাদ নতুন নয় কিন্তু ৫০ বছর বাদে হাজার হাজার তিওয়া এই গণহত্যায় সামিল হবে কেন?

শুধু নেলী নয়, সিলপাথার, মঙ্গলদৈ, ডিগবয় সব জায়গা থেকে সংঘর্ষ-হত্যা-আগুনের খবর আসছিল। দরং জেলার চাউলখোয়া ও খয়রাবাড়িতে বাঙ্গালী হিন্দু ও মুসলমানরা আক্রান্ত হন। বোড়ো জনজাতির মানুষদের তাড়া করে অরুণাচল সীমান্তে পাঠানো হয়। হিতেশ্বর শইকিয়া নেলীর ঘটনার তদন্তের জন্য টি পি তেওয়ারী কমিশন তৈরি করেন। সেই কমিশনের রিপোর্ট দিনের আলো দেখেনি। নিহতদের পরিবার বা আহতরা কিংবা যাঁরা বাসস্থান, ফসল  হারিয়েছেন তাঁরা কেউ ক্ষতিপুরণ পান নি।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে ১৯৮৩ সালে গুয়াহাটির মালিগাঁও ময়দানে এক জনসভায় অটল বিহারী বাজপেয়ী  বলেছিলেন ‘খুন কা নদীয়া বহেঙ্গি’ যদি সরকার নির্বাচন করে। নেলী-হত্যাকান্ডের পর অসম আন্দোলনের প্রকৃতি বদলে যায়। আর এস এস আন্দোলনকে প্রভাবিত করে বলে অভিযোগ ওঠে। অসমিয়া মুসলমানরা অনেকে অসম আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। নেলী ও অন্যান্য মুসলমান হত্যার ঘটনায় এদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। 

এরপরেও অসমে ভোট হয় এবং কংগ্রেস জয়ী হয়। হিতেশ্বর শইকিয়া মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন। 

অসমে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য ১৯৮৫ সালের ১৫ অগাস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ‘আসু’ ও ‘অগপ’  সাথে অসম চুক্তি সম্পাদন করেন। 

 অসম চুক্তিতে আন্দোলনের প্রধান যুক্তিকে মেনে নেওয়া হয়। ১৯৬৫ এর পরে আসা বিদেশিদের ১০ বছরের জন্য ভোটার লিস্ট থেকে বের করে দেওয়া হবে। ২৪ মার্চ, ১৯৭১ – এর পরে আসা বিদেশিদের বহিস্কার করা হবে।

অসম চুক্তি সবর্ণ অসমিয়া নেতৃত্বাধীন আসু/অগপ এবং কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তিতে নেই বাঙ্গালি(হিন্দু/মুসমান), বোড়ো, কার্বি, ডিমাসা, তিয়া, মিসিং কিংবা ঝাড়খন্ডীরা। যেন তাঁরা অসমের কেউ নন, তাঁদের কোনো অংশীদারিত্ব নেই। অসম চুক্তির পর মূলতঃ বোড়ো – কাছারিদের মুখপত্র ‘দি প্লেন্স ট্রাইবাল কাউন্সিল অব আসাম’ বা ‘পিটিসিএ’ খুবই বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। বোড়োরা পিটিসিএ- র মাধ্যমে অসমের মধ্যে স্বশাসিত অঞ্চল দাবি করে আসছিল, অবশেষে তারা স্বশাসিত  বোড়োল্যান্ড কাউন্সিল নিয়ে সন্তুষ্ট হয়।       

১৯৮৫ হিতেশ্বর শইকিয়া পদত্যাগ করে এবং অসমে ফের  নির্বাচন হয়। নির্বাচনে জিতে ‘অসম গণপরিষদ’  ক্ষমতায় আসে। 

১৯৯১ সালে নির্বাচনে হিতেশ্বর শইকিয়ার নেতৃত্বে কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে। ১৯৯৬ সালে হিতেশ্বর শইকিয়ার মৃত্যু হলে তরুন গগৈ মুখ্যমন্ত্রী হন। এই দুই মুখ্যমন্ত্রী অসমে শান্তি শৃঙ্গলা ও ধর্মীয় ও ভাষিক সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বজায় রেখেছিলেন।

২০০৪ সালে কেন্দ্রের মনমোহন সিং সরকার ও রাজ্যে তরুণ গগৈ সরকারের সাথে ‘আসু’ র ফের এক চুক্তি হয় এতে স্থির হয় ১৯৫১ সালের সালে হওয়া নাগরিক পঞ্জি সংশোধন করা হবে। বিদেশি চিহ্নিতকরণের নানা প্রক্রিয়া চলতে থাকলেও অল মুসলিম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন -এর আন্দোলনের ফলে কংগ্রেস সরকার এন আর সি জোরালো ভাবে চালু করে নি।     

২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় নরেন্দ্র মোদী প্রচার চালান ক্ষমতায় এলে তাঁনাগরিক-পঞ্জিরা সব বিদেশিকে(আসলে মুসলমানদের ) বিতারণ করবেন। এই নির্বাচনে বিজেপি ভাল ফল করে। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে অসমে বিজেপি, অগপ ও বোরো জনজাতির একাংশের রামধনু জোট ক্ষমতায় আসে । বাঙ্গালি হিন্দুদের একটা বড় অংশ বিজেপির প্রতি মোহগ্রস্থ হয়ে ওই রামধনু জোটকে ভোট দেয়। তারা ভেবেছিল নাগরিকত্বের প্রশ্নে তারা হিন্দু বলে রক্ষা পাবে। 

২০১৪ সালে আসু প্রভাবিত এনজিও ‘আসাম পাব্লিক ওয়ার্কস’ সুপ্রীম কোর্টে আবেদন জানিয়ে বলে অসম চুক্তির প্রধান ধারা -বিদেশি সনাক্তকরণ, ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া- বলবৎ করা হোক।   

২০১৪ সালের ২০ অগাষ্ট বিচারপতি রঞ্জন গগৈ ও আর কে আগরওয়াল নাগরিক-পঞ্জি  নবীকরণের জন্য নির্দেশ দেন। 

বিজেপি- এর নেতৃত্বে রামধনু সরকার প্রতিষ্ঠার পর অতি দ্রুততার সাথে এই কাজ শুরু হয়। ২০১৪,৩০ জুলাই খসড়া তালিকা প্রকাশ করে জানানো হয় অসমে বেআইনি অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা ৪০,০০,৭০৭। 

তথ্যসূত্রঃ

দেবাশিস আইচ 

আর ক-কটি উপত্যকা পেরোবেন কালীকিশোরেরা?

groundxero কর্তৃক প্রকাশিত ( আগস্ট ১১, ২০১৮ )

দেবর্ষি দাস 

আসামে নাগরিক-পঞ্জির সাতকাহন 

পিপলস স্টাডি সার্কেল কর্তৃক প্রকাশিত ( সেপ্টেম্বর, ২০১৮)

শান্তনু  দত্তচৌধুরী 

(গবেষণাপত্র) 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *