সাকিনে চান্সেয:-এক কিংবদন্তির অপমৃত্যু

আজ থেকে ঠিক ৩বছর পূর্বে আজকের দিনে ৯ই জানুয়ারি ২০১৩ সালের কাক ভোরে ‘প্যারিসে’ কুর্দিস্তান ইনফরমেশন সেন্টারের মেঝেতে শায়িত তিনজন মহিলার গুলিবিদ্ধ দেহ উদ্ধার করে ফ্রান্সের পুলিস ।মুহূর্তের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ে লোক মুখে ,টিভির পর্দায় । ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ভ হাজারে হাজারে জনতা জমা হতে শুরু করে’’কুর্দিস্তান ইনফরমেশন সেন্টার ‘এর সামনে। তিনজন মহিলার মধ্যে দুইজনকে মাথায় এবং বাকি একজনকে মাথায় এবং পেটে খুব কাছ থেকে সাইলেন্সার লাগানো বন্দুক থেকে গুলি করা হয়েছিল বলে খবর প্রকাশিত হয় -গুলিবিদ্ধ তিনজন মহিলার মধ্যে অন্যতম মহিলা ছিলেন ‘সাকিনে চান্সিয ‘। কে এই ‘সাকিনে চান্সিয ‘ ? ৫২ বছরের ‘সাকিনে চান্সিয ‘কুর্দ জনতার -বিশেষত রাষ্ট্রবিরোধী মহিলা প্রতিরোধ ইতিহাসের জীবন্ত রূপকথা-নারী স্বাধীনতা আন্দোলনের রোল মডেল। ১৯৮০সাল পরবর্তী কুর্দ প্রজন্ম সাকিনে চান্সিযের তুরস্কের জেলের ভেতরে সরকার বিরোধী অসামান্য প্রতিরোধের ইতিহাস শুনে ,পার্টির ভেতরে এবং পার্টির বাইরে পুরুষ প্রাধান্যের বিরুদ্ধে অনমনীয় লড়াইয়ের ইতিহাস জেনে বড় হয়েছে । কুর্দ প্রজন্ম সাকিনে চান্সিযের নির্ভীকতার গল্পে অনুপ্রাণিত হয়েছে ,সংগঠিত হয়েছে -তাই প্যারিসের মত আপাত নিরাপদ শহরে গুপ্তঘাতকের হাতে ‘সাকিনে চান্সিযের মৃত্যুর খবর লক্ষ লক্ষ কুর্দ জনতার কাছে পাথরের মত ভারি ,হৃদয় বিদারক ক্ষোভ এবং স্বজনহারানোরবেদনা।

শত অত্যাচার ,দমন পীড়ন ,কঠিন জীবন এবং মৃত্যুভয় অগ্রাহ্য করে কিছু কিছু মানুষ কেন প্রতিরোধ করেন ? কেনই বা প্রতিরোধের নেতৃত্ব দেন ? কারন এক নতুন জগতের কল্পনাই মানুষ কে মানুষ বানায় । কিছু মানুষ , বিশিষ্ট মানুষ এক অন্যজগতের কথা কল্পনা করতে পারেন । লাখো মানুষ কে সেই স্বপ্নের সঙ্গী এবং উদ্বেলিত করতে পারেন । ১৯৭০ এর দশকে, সদ্য কলেজ উত্তীর্ন ‘সাকিনে চান্সিয’, আবদুল্লা অচলান এবং তার যুবক বয়সের ২২ জন সাথী ঠিক এই কাজই শুরু করেছিলেন তুরস্কের এক গ্রামের খামার বাড়ি থেকে । কল্পনা । তারা কল্পনা করেছিলেন -শোষণ হীন এক জগৎ , যেখানে নারী প্রত্যহ পদ দলিত হবেনা, উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদ ক্ষুদ্র জনজাতির অস্তিত্বকে অস্বীকার করবেনা ,আধিপত্যবাদী মেকি গণতন্ত্র ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে জনতাকে রাবার স্ট্যাম্প হিসাবে ব্যবহার করবে না। এবং পুঁজিবাদ মানুষ কে নিঃস্ব করবেনা প্রত্যহ । ১৯৭৮ সালে হাজারো বছরের কুর্দ দমনের ইতিহাস পালটে দিতে, কুর্দদের অস্তিত্ব এবং স্বাধীনতা অর্জন করতে আবদুল্লা অচালান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কুর্দিশ ওয়ারকার্স পার্টি (পি.কে .কে)‘সাকিনে চান্সিয’ ছিলেন সেই পি.কে.কের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ।

১৯৫৮ সালে পূর্ব তুরস্কের ‘টুঞ্চেলি’ প্রদেশে কুর্দ রক্ষণশীল পরিবারে জন্মানো সাকিনে, পারিবারিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ৭০এর দশকের মাঝামাঝি সময় প্রকৃত অর্থে বাড়ি থেকে পালিয়ে আঙ্কারায় এসে কলেজে পড়াশুনা শুরু করেন । আঙ্কারায় প্রথম পরিচিত হন আবদুল্লাহ অচালানের সাথে । অচালানের সাহচর্যের প্রতিটি মুহূর্ত ,প্রতিটি আলোচনা ক্রমাগত ভার বাড়াতে থাকে- সাকিনে চান্সিয’ বুঝতে থাকেন অচালান যে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখছেন তা অত্যন্ত কঠিন পথ, দীর্ঘস্থায়ী ক্রমাগত প্রতিরোধ ,ধৈর্য এবং সতর্কতার মেলবন্ধন । ২২ বছরের সাকিনে কুর্দ স্বাধীনতা ,নারী স্বাধীনতার স্বার্থে যে কোন চরমে পৌঁছানোর ইস্পাত কঠিন মানসিক ক্ষমতার অধিকারী হতে থাকেন অতি দ্রুত ।

পিকেকে প্রতিষ্ঠার পর ‘সাকিনে চান্সিয ‘ তুরস্কের ‘এলাযিগ’ প্রদেশে পার্টি প্রতিষ্ঠা এবং বিস্তারের স্বাধীন দ্বায়িত্ব গ্রহণ করেন । ১৯৮০ সালের তুরস্কের মিলিটারি অভুথ্যানের সময়ে পিকেকে / মিলিটারি এক সংঘর্ষে আহত সাকিনে চান্সিয মিলিটারি পুলিসের হাতে ধরা পড়েন,শুরু হয় অকথ্য অত্যাচার এবং তুরস্কের কুখ্যাত দিয়ারবাকির কারাগারের চরম অত্যাচারিত দীর্ঘ এক দশকের কারাবাস । ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৮৪ সালের মধ্যে এই কারাগারে পিকেকের ৩৪ জন রাজনৈতিক বন্দী অসহনীয় অত্যাচারে প্রাণ হারান ,হাজারো রাজনৈতিক বন্দী চিরজীবনের মত পঙ্গু হয়ে যান । কারাগারের মধ্যে সাধারণ বন্দী এবং রাজনৈতিক বন্দীদের সংঘটিত করে ‘সাকিনে চান্সিয’ চালাতে থাকেন এক অসাধারণ প্রতিরোধের ইতিহাস -গণ অনশন ,গন অসহযোগিতা। ১৯৮২ সালে জেলের অসহনীয় বর্বর ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক বন্দীদের নুন্যতম অধিকারের দাবীতে পিকেকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য কেমাল পীর আমরণ অনশন শুরু করেন ,জেলখানায় আগুন লাগিয়ে দেন, অবশেষে অনশনে অটল দিয়ারবাকির কারাগারে কেমাল পীর মৃত্যু বরণ করেন। এই অসাধারণ প্রতিরোধের এবং আত্মবলিদানের ইতিহাস ,ঘটনাক্রম ক্রমে কুর্দ জনজাতিকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একত্রিত করতে শুরু করে -তুরস্কের মানবধিকার লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতা তৎ জনিত দেশের ভেতরে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের রাজনৈতিক চাপের কাছে তুরস্কের সরকার কিছুটা নমনীয় হতে থাকে । ১৯৮৪ সালে মিলিটারি শাসনের অবসানে তুরস্কে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসে। কিছু অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হতে থাকে, দীর্ঘ এক দশকের কারাবাসের অবশেষে ‘সাকিনে চান্সিয’ মুক্তি পান ।

জেলখানা থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত সাকিনে ,অচালান প্রতিষ্ঠিত লেবানন অবস্থিত পিকেকের গেরিলা ট্রেনিং ক্যাম্পে যোগদান করেন । ট্রেনিং অবশেষে উত্তর ইরাকে এবং তুরস্ক জুড়ে গড়ে তুলতে থাকেন পিকেকের মহিলা গেরিলা বাহিনী ,নারীমুক্তির অভূতপূর্ব আন্দোলন। অচালানের নারীমুক্তি আন্দোলনের তত্ব পৃথিবীর অর্ধেক শক্তি, নারী শক্তির বুদ্ধিমত্তা ,প্রতিভা এবং ক্ষমতার বিশ্বজুড়ে এই চূড়ান্ত অবহেলা শুধু অ্যাবসার্ডই নয় বরং অমার্জনীয় অপরাধ ‘এই তত্বের ভিত্তিতে প্রথমে পার্টির ভেতরে এবং রক্ষণশীল সুন্নী কুর্দ সম্প্রদায়ের হাজারো বছরের পুরুষ আধিপত্যের ইতিহাস গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পালটে দেওয়ার যে দীর্ঘ আন্দোলন -সাকিনে চান্সিয ছিলেন তার প্রধান কারিগর ।

সাকিনে বিশ্বাস করতেন “you can’t get rid of capitalism without getting rid of the state, you can’t get rid of the state without getting rid of patriarchy.” পিকেকে পৃথিবীর একমাত্র রাজনৈতিক সংগঠন যেখানে সমস্ত পদ যৌথ নেতৃত্বের মাধ্যমে পরিচালিত হয় । এই যৌথ নেতৃত্বের একজন অবশ্যই মহিলা হওয়া বাধ্যতামূলক । আজকের তুরস্কে ,কুর্দিস্তানে, রোজাভায় যে কোন সরকারী সংস্থায় ,রাজনৈতিক সংগঠনে সমপরিমাণ মহিলা প্রতিনিধিত্বর যে অশ্রুতপূর্ব উপস্থিতি , সমস্ত নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে নারীদের যে গুরুত্ব -হাজারো বছরের পুরুষ আধিপত্যের ইতিহাস চুরমার করে দেওয়ার যে সচেতন প্রয়াস, সাকিনে চান্সিয ছিলেন তার প্রধান রূপকার।

বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল রক্ষণশীল শক্তির বিরুদ্ধে সাকিনে ছিলেন অপ্রতিরোধ্য ,সটান এবং সবল । সাকিনের সচেতন নারীমুক্তির আন্দোলনের ফলে বর্তমানে তুরস্কে ,কুর্দিস্তানে, রোজাভায় পার্টির অভ্যন্তরে এবং বাইরের বিপুল কুর্দ সমাজে পুরুষ আধিপত্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এককথায় অসম্ভব । ১৯৯০ এর মাঝামাঝি সাকিনে ইউরোপে কুর্দপ্রশ্নের সমর্থনে আন্তর্জাতিক মতামত গড়ে তোলা ,নিষিদ্ধ পিকেকের অর্থের যোগান এবং সিআইএর মতে অস্ত্রের যোগানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন । ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কুর্দ জনতার মধ্যে গন সংগঠন গড়ে তোলা ,তুরস্কের সরকারের অকথ্য অত্যচারের তথ্যাবলী আন্তর্জাতিক মহলে প্রকাশ, এবং পিকেকের সাথে তুরস্কের সরকারের শান্তিপ্রয়াসের যে দীর্ঘ নেগোসিয়েশন, সাকিনে ছিলেন তার পুরোভাগে ।

জেলবন্দী অচালনের সাথে তুরস্কের সরকারের শান্তিচুক্তি সাক্ষরিত হওয়ার ঠিক পূর্বেই সাকিনে চান্সিযের প্যারিসের মত শহরে গুপ্তঘাতকের হাতে মৃত্যু এই শান্তিচুক্তি ভেস্তে দেওয়ার প্রয়াস হিসাবে গণ্য । ২০১৩ সালে প্যারিসে এই গুপ্তহত্যার রহস্য এখনও ভেদ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি কিন্তু পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ এই গুপ্তহত্যার পেছনে যে তুরস্কের ফ্যাসিবাদী সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের হাত ছিল সে বিষয়ে আমাদের সন্দেহের অবসান ঘটিয়েছে বহু পূর্বে ।

সাকিনে চান্সিয ইতিহাস । কুর্দিশস্বাধীনতা আন্দোলনের নারী স্বাধীনতার প্রধান মুখ। তিনিই সেই মহিলা যিনি তার অত্যাচারীর মুখে জেলখানার ভেতরে থুথু ছুঁড়ে মারেন । জেলখানায় তার স্তন কেটে দেওয়ার মুহূর্তেও তিনি অবিচল থাকেন ; “As a militant of a just cause, I was ashamed to say ‘Ah’”. তিনিই সেই টকটকে লাল চুলের ,ভরপুর জীবন্ত ,নিয়মনিষ্ঠ শাকাহারি , অনবদ্য স্পষ্টবক্তা স্বাধীন মহিলা। ।

ইতিহাস সাকিনে চান্সিয কে কুর্দিশ জনতার স্বাধীনতা আন্দোলনের ,বিশেষত নারীমুক্তি আন্দোলনের সবল সমর্থক এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সংগ্রামী ভূমিকার জন্য মনে রাখবে । সাকিনে চান্সিয কখনোই সন্ত্রাসবাদী নন বরং তিনি সেই বিরল হিরোদের অন্যতম এমনকি শত্রু যার অন্তিম যাত্রায় শ্রদ্ধায় নতমস্তক হয়। আজ সকালে সাকিনে চান্সিযের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে হাজারো স্বাধীনতাকামী মানুষ প্যারিসের রাজপথে পা মিলিয়েছেন। বিশ্বের ১৮টি ভাষার সাবটাইটেল সমেত মুক্তি পেয়েছে “My whole life was a struggle “ -সাকিনের আত্মজীবনী অবলম্বনে এক ঐতিহাসিক তথ্যচিত্র । আগ্রহী পাঠকের উদ্দেশ্যে তথ্যচিত্রের সংক্ষিপ্ত অংশটি সংযুক্ত হোল । Sara – Sakine Cansiz – My Whole Life Was A Struggle (Trailer) https://youtu.be/5Pouz_tC1vA via @YouTube

Debabrata Chakrabarty

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *